শেষ পর্যন্ত কী অভাবের কাছে হার মানবে মেধাবী নাজমুল হুসাইন। এই শংকা তাকে আষ্টেপিষ্টে ধরেছে। অভাবের সংসারের ঘানি টানার পরও এবছর এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে নাজমুল।

">
Pran All Time

অভাবের কাছেই কী পরাস্ত হবে মেধাবী নাজমুলের স্বপ্ন

UNB NEWS

শনিবার ২১ জুলাই, ২০১৮ ১১:৪০:৪২ এএম

অভাবের কাছেই কী পরাস্ত হবে মেধাবী নাজমুলের স্বপ্ন

কুষ্টিয়া, ২১ জুলাই (ইউএনবি)- শেষ পর্যন্ত কী অভাবের কাছে হার মানবে মেধাবী নাজমুল হুসাইন। এই শংকা তাকে আষ্টেপিষ্টে ধরেছে। অভাবের সংসারের ঘানি টানার পরও এবছর এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে নাজমুল।

তার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়া। তারপর বিসিএস দিয়ে পুলিশ ক্যাডারে চাকরি নিয়ে দেশের সেবা করা। কিন্তু দারিদ্র্যতা তাকে সেই পর্যন্ত পৌঁছাবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কিত সে।  

প্রাইভেট টিউশনি আর দিনমজুরি করে সংসারের ভার বহনের পাশাপাশি পড়া লেখা চালিয়ে যায় এ হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তান। কৃতিত্বের সাথে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার হালসা ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা।

কিন্তু অভাব-অনাটনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত কি অধরাই থেকে যাবে- এ শংকায় উদ্বিগ্ন নাজমুল। উদ্বিগ্ন নাজমুলের দিনমজুর বাবা আজিজ হোসেন ও মা নাসিমা খাতুনও। তাদের একটিই কথা, শেষ পর্যন্ত অভাবের কাছেই পরাস্ত হবে তাদের স্বপ্ন?

মিরপুর উপজেলার নিভৃত পল্লী কুর্শা ইউনিয়নের মাজিহাট গ্রামের হত দরিদ্র দিনমজুর আজিজ হোসেন ও নাসিমা খাতুনের দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে সবার বড় নাজমুল। আজিজ হোসেনের নিজের কোন জমি নেই। সহায়-সম্বল বলতে গেলে দুই কাঠা জায়গার উপরে নির্মিত টিনের কুঁড়ে ঘরটি। সামান্য দিনমজুরি করে ঠিক মতো সংসার চলে না। তাও আবার সব দিন হাতে কাজ থাকে না। যেদিন হাতে কাজ থাকে না সেদিন এক-আধ বেলা সবাইকে উপোষ থাকতে হয়। মা নাসিমা খাতুনও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। ছোট বোন আর্জিনা খাতুন একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। মাঝিহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী।

সংসার চালাতে গিয়ে বাবাকে হিমশিম খেতে দেখে ৮ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় নাজমুল প্রাইভেট টিউশনি শুরু করে। কোনো কোনো দিন আবার চলে পিতার সাথে দিনমজুরি। এভাবে প্রাইভেট টিউশনি আর দিনমজুরি করে মাঝিহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪ দশমিক ৫৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় নাজমুল। এইচএসসিতে ভর্তি হয় মিরপুর উপজেলার হালসা ডিগ্রি কলেজে। প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করেও  এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে দারিদ্র্যতাকে পেছনে ফেলে যে সফলতা পাওয়া যায় তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নাজমুল। তার এই অভাবনীয় ফলাফলে পরিবার, শিক্ষক, এলাকাবাসী সবাই খুশি।

নাজমুল জানায়, টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে পারিনি। যতটুকু অবসর পেয়েছি নিজেই বাসায় পড়াশোনা করেছি। নাজমুলের এই ভালো ফলাফলে সবাই খুশি হলেও শেষ পর্যন্ত অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হবে কিনা এ নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। নাজমুলের ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পড়া। পড়ালেখা শেষ করে বিসিএস দিয়ে পুলিশ ক্যাডারে চাকরি নেয়ার ইচ্ছা তার।

মা নাসিমা খাতুন বলেন, টাকার অভাবে নাজমুল মাঠে কাজ করেছে। প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের পড়ালেখার খরচ জুগিয়েছে।

হালসা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন,নাজমুল আমাদের কলেজের গর্ব। প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করেও আজ  সে এ পর্যন্ত এসেছে।

নাজমুলের উচ্চ শিক্ষা লাভের স্বপ্ন পূরণে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

নাজমুলের আরেক শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রায় দিনই নাজমুল কলেজে আসতে পারতো না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সে কারোর বাড়িতে কামলা খাটতে গিয়েছে লেখা পড়ার অর্থ জোগাড় করতে।

নাজমুলের পিতা আজিজ হোসেন বলেন, আমার ইচ্ছা ছেলে তার একদিন অনেক বড় হবে, মানুষের মত মানুষ হবে। কিন্তু দারিদ্র্যতা তারে সে ইচ্ছায় ভাগড়া দেয় কিনা এ নিয়ে শঙ্কিত তিনি।