Pran All Time

ওপরে, অনেক উঁচুতে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা চিল।

ওপরে, অনেক উঁচুতে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা চিল। নিচে চোখধাঁধানো রোদ,

UNB NEWS

সোমবার ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০৭:৩২:৫১ পিএম

ওপরে, অনেক উঁচুতে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা চিল।

ওপরে, অনেক উঁচুতে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা চিল। নিচে চোখধাঁধানো রোদ, আকাশ থেকে যেন রুপা গলে গলে পড়ছে। সেই রোদের মধ্যে এলোপাতাড়ি দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো খালি ট্রাক: সারা রাত জেগে শত শত মাইল পথ দৌড়ে এসে এখন ক্লান্ত।
পলিথিনের একটা ছাউনির দুয়ারে খটখটে মাটিতে বসে একটা অ্যালুমিনিয়ামের থালায় চাল বাছছে ফতেমা নামের এক নারী। সে চালগুলো কারওয়ান বাজার থেকে কুড়িয়ে এনেছে; খড়কুটো আর নুড়ি-কাঁকড়ে ভরা পোয়াখানেক চাল। রান্নার উপযোগী করতে হলে তাকে সারাটা দুপুর ধরে বাছতে হবে এই চাল। গভীর মনোযোগে সে তা-ই করছে।
একটু দূরে বিশাল এক ট্রাকের পেটের নিচে চিত হয়ে শুয়ে লোহার যন্ত্রপাতি দিয়ে মেরামতির কাজ করছে ট্রাকের ড্রাইভার। বহুক্ষণ ধরে চলছে তার এই কসরত। তার আশপাশে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফতেমার ছেলে। এটাও চলছে বহুক্ষণ ধরেই। ছেলেটার নিজের শরীরে এক রত্তি কাপড় নেই। সেই হিংসাতেই কি না কে জানে, সে কয়েকবার লোকটার লুঙ্গি ধরে টানাটানি করেছে। লোকটা লুঙ্গি সামলাতে সামলাতে কাক তাড়ানোর মতো হই হুস শব্দ করে ছেলেটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাতে ফল হচ্ছিল না দেখে ধমক দিয়েছে। ‘হালা বজ্জাত পোলা’ বলে গালি দিয়েছে। ‘নিজেরটা থুইয়া অন্যেরটা দ্যাখতে আহস ক্যারে?’ বলতে বলতে নিজেই হেসেছে।
ছেলেটা তখন আপন মনে ত ত দ দ বলতে বলতে মাটি নিয়ে খেলা আরম্ভ করে। খেলতে খেলতে যখন খিদে পায়, তখন মাটি খায়।
মানুষের বাচ্চা মাটি খায়। মুঠিভর্তি কালো মাটি মুখে পোরে, শব্দ করে: ফ্রু ফ্রু। নুড়ি, কাঁকড়, ময়লা কাগজ, খোলামকুচি—যখন যা হাতের কাছে পায়, চুক চুক করে চোষে। বৃষ্টির দিনে বস্তির মাটি ফুঁড়ে কিলবিলিয়ে বেরিয়ে আসা কেঁচো মাটিসুদ্ধ খামচে ধরে মুখে দেয়। রোদে পোড়া খরার দিনে কখনো উবু হয়ে শুকনো গরম মাটি চাটে, কখনো দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের চাকার শীতল ধাতব অংশে গাল পেতে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।
তার মায়ের বিয়ে হয়েছে চারবার, কিন্তু সব স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার বাচ্চা হয়েছে ১৩টা; কিন্তু সব কটি মরে গিয়ে এখন আছে মাত্র একটা। প্রতিবেশীরা বলে, এটাও মরবে। ট্রাক, রিকশা, রেলগাড়ি অথবা ভূতপ্রেত—যে কেউ যেকোনো দিন যেকোনো মুহূর্তে আজরাইল সেজে এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে।
ফতেমারও এই এক ভয়: শেষ ছাওটাও যদি মরে যায়, তার আর কিছুই থাকবে না। কোনো পুরুষ তার দিকে আর ফিরেও তাকায় না। তার আর কিছু নেই। এখন সে এক কিম্ভূত প্রাণী। তার মতো ঢ্যাঙা, এত লম্বা, এমন শুকনো আর এহেন কালো মেয়েমানুষ আর হয় না। বুক নেই, নিতম্ব নেই, পেট নেই, পিঠ নেই। গায়ের রং আর চুলের রঙে তফাত নেই। চুল লম্বা, কোমর পর্যন্ত নেমে মরা সাপের মতো ঝোলে। চোখের দুই কোণ সব সময় লাল, মুখমণ্ডলের সমস্তটাই ঝামা ইট। হাতগুলো, হাতের আঙুলগুলো এত লম্বা আর এমন হাড্ডিসার যে দেখে ভুল হয়—মানুষ তো?
প্রতিবেশীরা যখন বলে, ‘তোর পুলা আইজ-কাইলের মদ্যেই মরব’, তখন ফতেমা চুপ মেরে থাকে। কালিঝুলিছাইমাখা মেয়েমানুষটি সারা দিন খুদকণা খুঁটে বেড়ায় আর হামাটানা ছেলেটার ঠ্যাং ধরে টানাহেঁচড়া করতে করতে বলে, ‘তরে আমি মরতে দিলে ত!’ কখনো চলন্ত রিকশার তলা থেকে, কখনো থেমে থাকা ট্রাকের চাকার ফাঁকফোকর থেকে টেনে বের করে আনে আর অবোধ ছেলের সঙ্গে কথা বলে, ‘তুই মইলে মোরে বুড়া বয়েসে খাওয়াইব কেডা?’
কিন্তু মাকে দিনমান উদ্বিগ্ন করে রাখবে বলেই ছেলেটা পৃথিবীতে এসেছে। মা তাকে একটা ট্রাকের তলা থেকে ঠ্যাং ধরে টেনে বের করে এনে পাশ ফিরে একটু দম নিতেই সে আবার গুট গুট করে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায় রাস্তায়, অথবা সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ে অন্য কোনো চিপাচাপার মধ্যে।
ফতেমা চাল বাছে আর ফিরে ফিরে তাকায় ছেলের দিকে। ছেলে ট্রাকের টায়ার কামড়ায়, লোহালক্কড় চাটে, ড্রাইভারের লুঙ্গি ধরে টান দেয়, ধমক খেয়ে একটু পিছিয়ে আসে, আবার একটু পরই এগিয়ে গিয়ে ফের হাত বাড়ায়। ক্লান্ত ট্রাকেরা চোখের বাতি নিভিয়ে ঝিমায়। তাদের পেটের তলে বিছানা পেতে ঘুমায় ড্রাইভার ও হেলপারেরা; যারা জেগে থাকে তারা গোল হয়ে বসে তাস খেলে।
বস্তির অন্য লোকজন কাজের খোঁজে বেরিয়ে গেছে। এইখানে, কর্মব্যস্ত মহানগরের এক কোণে এখন অলস অবসন্ন দুপুর স্থির হয়ে আছে।

একটা কাক বেশ সাহসী ভঙ্গিতে পা ফেলে এগিয়ে আসে ফতেমার অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রের দিকে। ফতেমা চাল থেকে নুড়ি বাছাই করে কাকটার দিকে ছুড়ে মারে। কাক নুড়িতে ঠোকর দিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকায় প্রতারক নারীটির দিকে।
ফতেমা হাত নাড়ে, ‘হুই!’
কাক প্রতিবাদে লাফিয়ে ওঠে: কা কা।
ফতেমা আবার তাড়া করে তাকে। জেদি কাক একটা মরা গাছের ডালে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে শুরু করে তুমুল চিৎকার। ফতেমা আবার নিজের কাজে মন দেয়, কিন্তু কাকটার চিৎকার আর থামে না। গলা তিরের মতো টান টান করে সে অবিরাম চিৎকার করে চলে।
ফতেমার অস্বস্তি লাগে; বুকে অশুভ আশঙ্কা জাগে। সে ঘাড় তুলে কাকটার দিকে তাকায়। মনে মনে বলে, কী ব্যাপার! কাক মরা গাছের ডালে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে ফতেমার দিকে চেয়ে তারস্বরে চিৎকার করে চলেছে; তার ওপরে আকাশে এখন চক্কর খাচ্ছে একটা মাত্র চিল। পাখা দুটি উড়োজাহাজের মতো দুপাশে মেলে দিয়ে ঘাড়টা নিচের দিকে নামিয়ে বাঁকানো ঠোঁট আরও বেঁকিয়ে ছোঁ মারার পাঁয়তারা করছে যেন। ফতেমার হাত থেমে যায়, বকের মতো গলা বাড়িয়ে সে চেয়ে থাকে আকাশে ঘুরন্ত চিল ও মরা গাছের ডালে চিৎকারে ব্যস্ত কাকটার দিকে। দুপুরের নৈঃশব্দ্য চিরে শুধু একটা কাকের অবিরাম চিৎকার, সেই চিৎকারের জবাবে এক রহস্যময় গম্ভীর নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ পাশের মসজিদের মাইকে জোহরের আজান বেজে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় কাকের চিৎকার। স্থির দুপুরের অচঞ্চল মুহূর্তের নৈঃশব্দ্যের শূন্যতা ভরিয়ে রাখে আজান।
হঠাৎ গর্জন করে চালু হলো ট্রাকের ইঞ্জিন। ফতেমার হাত থেকে নুড়ি-কাঁকড়-চালসুদ্ধ অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রটা পড়ে গেল। মটমট শব্দে ঘুরে গেল তার ঘাড়।
ফতেমা দেখতে পেল, মেরামতি চলছিল যে ট্রাকের, সে-ই এখন গর্জন করছে। তার তলা থেকে ড্রাইভার উধাও। কিন্তু ফতেমা দেখতে পেল না যে তার ছেলেটা ঢুকে পড়েছে ট্রাকের পেটের তলায়।
ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দ বাড়ে-কমে। যখন গাঁ গাঁ শব্দে ট্রাকের তলায় তোলপাড় ওঠে, তখন ফতেমার ছেলেটা মজা পেয়ে খক খক খক করে হেসে ওঠে। সে হামাগুড়ি দিয়ে নাচতে নাচতে ট্রাকটার পেছনের চাকার সামনে এসে থামে। ঘাড় বাঁকা করে মাথাটা ওপরের দিকে তুলে ট্রাকের পেটের কলকবজার মধ্যে শব্দের উৎস খোঁজে। তারপর দুই হাঁটুর ওপর দাঁড়িয়ে দুহাতে চাকার টায়ার থাবড়ায়।
হঠাৎ প্রচণ্ড গাঁ গাঁ শব্দে ট্রাকটা নড়ে উঠল। আর এক ইঞ্চি এগোলেই ছেলেটা পিষে যাবে।
ফতেমার দুই হাত খপ করে চেপে ধরল ট্রাকের পিছারি। মটমট শব্দে বেজে উঠল তার শরীরের সমস্ত হাড়, ট্রাকের পেছনের অংশটা শূন্যে উঠে গেল।
মাটি থেকে হাত দুই ওপরে বন বন করে ঘুরছে বিশাল চাকা, ফতেমা দেখতে পেল, চাকার নিচে তার ছেলেটা ফোকলা মুখে হাসছে।
‘বাইরো! হারামজাদা বাইরো!’ ফতেমার নাকমুখ দিয়ে গরম বাতাসের হলকা বেরিয়ে গেল।
ছেলের কপালের ওপরে ট্রাকের চাকা শূন্যে বন বন করে ঘুরে চলল।
সেদিকে চেয়ে ছেলে খিকখিক করে হেসেই চলেছে।