Pran All Time

যুক্তি, আবেগ ও কূটকৌশলের সমাহার

যুক্তি, আবেগ ও কূটকৌশলের সমাহার

UNB NEWS

সোমবার ০৭ আগস্ট, ২০১৭ ০৭:০২:০৭ পিএম

যুক্তি, আবেগ ও কূটকৌশলের সমাহার

নাগরিকদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেনগত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের কিছু সদস্যের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন একটি সংলাপের আয়োজন করে। আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের অনেকে না গেলেও উপস্থিতি মন্দ ছিল না। আর অংশগ্রহণকারীরাও যথেষ্ট সময় নিয়ে আলোচনা করতে পেরেছেন। ধৈর্যের সঙ্গে কমিশন ও এর সচিবালয়ের কর্মকর্তারা সে সংলাপ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করেছেন। এমন আন্তরিকতা নিয়ে একটি সফল জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে অগ্রসর হলে তাদের যাত্রাপথের বিঘ্ন অনেক কমে যাবে।

সংলাপে অনেক বিষয় আলোচিত হয়েছে, এসেছে বেশ কিছু পরামর্শ। এসব পরামর্শ সবই আন্তরিক ছিল সন্দেহ নেই। পাশাপাশি ছিল যুক্তি ও আবেগ। ক্ষেত্রবিশেষে কূটকৌশলও ছিল। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলসহ আরও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপে বসবে কমিশন। স্বাভাবিকভাবে সবার মতামত নিয়ে তাদের ভাবনার সঙ্গে করবে সমন্বয় বিধান। সিদ্ধান্ত নেবে করণীয় সম্পর্কে। যেগুলো নিজেদের আওতায় তা বাস্তবায়ন কঠিন হওয়ার কথা নয়। আর আইনের সঙ্গে যেসব বিষয় সম্পর্কিত, তার জন্য আবশ্যক হবে সরকারের সমর্থন। কেননা, আইন সংশোধনের ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদের। বলার অপেক্ষা 
রাখে না, নির্বাচনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে অনেক মহল। আর সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি আইনি কাঠামো ও পরিচালনা ব্যবস্থাতেই নির্বাচন হওয়া সংগত। এর সবকিছুই আছে। প্রয়োজন হবে কিছু সংশোধন ও সংযোজন। যেসব মহল এ নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর।

সবাই বলে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা। অবশ্য নির্বাচন কথাটির আগে এ ধরনের বিশেষণের আবশ্যকতা নিয়ে মতভেদ আছে। ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় নির্বাচন মানেই জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকবে। শান্তিপূর্ণ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে যে যাঁর পছন্দমতো দেবেন ভোট। নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থার সঙ্গে যাঁরা সংশ্লিষ্ট, তাঁরা থাকবেন নিরপেক্ষ। নির্বাচনব্যবস্থাটিকে যেসব দেশ আত্মস্থ করেছে, তারা এ শব্দের আগে কোনো ধরনের বিশেষণ প্রয়োগ করে না। 
এই কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যে হাউস অব কমনসের নির্বাচন হয়ে গেল। ফলাফল সরকারব্যবস্থাকে একটু ধাক্কাও দিয়েছে। সে নির্বাচন শব্দটির আগে বা পরে অতিরিক্ত কোনো শব্দ সংযোজন করার প্রয়োজন কেউ বোধ করেনি। আমাদের মতো দেশে যেখানে নির্বাচনব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর ও  প্রশ্নবিদ্ধ, সে অভাজনেরাই এ শব্দটির আগে-পরে বিভিন্ন বিশেষণ নিয়ে আসছি। ধারণা করা হয়, চলমান ব্যবস্থাদির পরিবর্তন না হলে আরও নতুন কোনো শব্দ আনা হতে পারে এ ধরনের বাক্যে।

সংলাপে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে তার মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গ। বেশ কয়েকজন আলোচক এ বিষয়ে জোর দিয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন কমিশনকে। নিবন্ধনকৃত কতিপয় রাজনৈতিক দলের সভা-সমিতিতে সরকারের বাধা সৃষ্টি প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কিছুদিন আগে বলেছিলেন তফসিল ঘোষণার আগে এ বিষয়ে কমিশনের করণীয় কিছু নেই। বক্তব্যটি নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে কমিশনের সদিচ্ছা বা সক্ষমতা সম্পর্কে কিছুটা সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। প্রসঙ্গটি সংলাপে উঠে আসে।

উল্লেখ্য, জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে নিবন্ধনকৃত রাজনৈতিক দলগুলো কমিশন থেকে যেসব সহায়তা পাওয়ার কথা, সে তালিকায় তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার কথা নেই। ওই বিবেচনায় স্থূল অর্থে সিইসি সঠিক। তবে নিবন্ধনের শর্ত পূরণের জন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলকে নিয়ত বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। আর সেখানে বাধা এলে সংশ্লিষ্ট দল সক্ষম হবে না নিবন্ধনের অনেক শর্ত পূরণে। তাই ব্যাপকার্থে এখানে কমিশনের ভূমিকা রয়েছে। নিবন্ধনকৃত দলগুলোকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে বাধা দেওয়া হলে কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবাদ করতে পারে। তাদের প্রতিবাদ সরকার সব ক্ষেত্রে উপেক্ষা করতে পারবে না। এ ধরনের কয়েকটি সক্রিয় উদ্যোগ কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলগুলো ও জনগণের আস্থা বাড়াবে।

সংলাপে অনেক কিছুই আলোচিত হয়েছে। তবে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং নির্বাচনকালে সেনা নিয়োগ প্রসঙ্গটি। নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখতে তফসিল ঘোষণার আগে ৩০০ আসনের ক্ষমতাবলয় ভেঙে দেওয়া অত্যাবশ্যক। এ বিষয়ে জোর দিয়ে তেমন কেউ বিরোধিতা করেননি। জাতীয় নির্বাচনে আমাদের দেশে ব্যতিক্রমহীনভাবে সামরিক বাহিনী নিয়োগ করা হয়। কখনো কখনো তা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সারা দেশে এক দিনে অনুষ্ঠিত হয়। ১০ কোটি ভোটার। ৫০ হাজারের অধিক ভোটকেন্দ্র। সে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত শুধু পুলিশ কিংবা তাদের সহযোগী আনসার সদস্যদের নিয়োগ শোচনীয়ভাবে অপ্রতুল হবে। র‍্যাব ও বিজিবি কেন্দ্রে মোতায়েন হয় না। মোবাইল ফোর্স হিসেবে কাজ করে। ঠিক তেমনি সামরিক বাহিনীও মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পুলিশসহ বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহের সামর্থ্য হালে যতটাই বৃদ্ধি পাক, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সামরিক বাহিনীকে বিরত রাখার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করার সংগত কারণ নেই।

 উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক পক্ষপাতের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে প্রস্তাবটি আরও জোরদার হয়। আর এ সেনা নিয়োগ আরপিওতে বিধান করে কিংবা বেসামরিক প্রশাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবে যেভাবেই হোক করা আবশ্যক। এ বিষয়ে একটু ভিন্নমত সংলাপে লক্ষণীয় হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে অনেকেই মনে করেন।

বিদেশি পর্যবেক্ষক অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে সংখ্যায় খুব কম হলেও কয়েকজনের অবস্থান বিস্ময়কর ঠেকেছে। তাঁরা বলতে চেয়েছেন আমরা জাতি হিসেবে পরিপক্ব। কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কি পরিপক্বতা পেয়েছে? জাতীয় নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। নতুনভাবে তা শুরু হয়েছে ২০১৪ থেকে। সংবিধানমাফিক নির্বাচন হয়েছে শুধু বললেই কি পার পাওয়া যায়?

আমরা এমন একটি দেশে বাস করছি, যেখানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি হচ্ছে। অপরদিকে আকাল সুশাসনের। আর তা সর্বক্ষেত্রে। আমাদের সীমিত কিছু ব্যতিক্রম বাদে চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ অনেক ডিগ্রির স্বীকৃতি নেই উন্নত বিশ্বে। সারা বিশ্ব যখন ক্রমান্বয়ে নিকটবর্তী হচ্ছে তখন আমাদের দূরে থাকা শুধু ইচ্ছার বিষয় নয়। আমাদের বেশ কিছু জাতীয় নির্বাচন প্রশংসিতও হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। বরং প্রশংসিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে করে ফেলেছি প্রশ্নবিদ্ধ। উল্লেখ করা যৌক্তিক, বর্তমান কমিশনের মেয়াদকালেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ফেনী ও বাগেরহাটে প্রায় সব প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এটা ২০১৪–এর জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বলে কেউ মনে করেন। অবশ্য এই কমিশনের সময়কালে একটি সিটি করপোরেশনসহ বেশ কিছু পৌরসভায় নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের জাতীয় নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি অপরিহার্য বললে অত্যুক্তি হবে না।

সংলাপে আলোচনা হয়েছে প্রশাসনে ব্যাপক রাজনীতিকীকরণ সম্পর্কে। এ জন্য নির্বাচনের আগে বড় ধরনের বদলির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে। এ কাজটি নির্বাচন কমিশন করতে পারবে তফসিল ঘোষণার পর। পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অন্তত তিন মাস সময় হাতে নিয়ে তফসিল ঘোষণা করতে। শুধু মাঠ প্রশাসন নয়, আরপিও সংশোধন করে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ওপরেও নির্বাচনকালে কমিশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরামর্শ এসেছে। এ সংশোধনের জন্য সরকারের সদিচ্ছা আবশ্যক। তবে কমিশন জোরালো অবস্থান নিলে সরকারকে কিছু একটা করতে হবে। ‘না’ ভোটের বিষয়ে বিপরীতমুখী আলোচনা হয়েছে। এটা আরও পর্যালোচনার দাবি রাখে। কিছু আইনগত সংস্কারের প্রশ্নও সংলাপে আলোচিত হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে নতুনভাবে আরপিও তৈরির উদ্যোগের বিপরীতে বলা হয়েছে, ভারতে ১৯৫১ সালে প্রণীত জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অসংখ্য সংশোধনীসহ এখনো কার্যকর আছে। এ ধরনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে ’৭২ সালে প্রণীত আরপিও প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ বলবৎ থাকতে পারে।

এসব আলোচনার মূল পরিপ্রেক্ষিত আগামীর জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলবে। কোনটি নেবে আর কোনটি নেবে না তা ঠিক করতে হবে কমিশন ও সরকারকে। তবে এমন কিছু করতে গিয়ে বিবেচনায় রাখা দরকার নির্বাচনটা হতে হবে সফল।