বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প এলাকায় বনবিভাগ নতুনভাবে সুন্দরবন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। সে অনুযায়ী ৪২০ একর জমিতে গরান, গেওয়া, কেওয়া, বাইন, গোলপাতা, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ কাজ শুরু করা হয়েছে।

">
Pran All Time

রামপালে গড়ে তোলা হবে ‘সুন্দরবন’!

UNB NEWS

শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০৬:০৯:০৫ পিএম

রামপালে গড়ে তোলা হবে ‘সুন্দরবন’!

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী

বাগেরহাট, ২৪ ফেব্রুয়ারি (ইউএনবি)- বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প এলাকায় বনবিভাগ নতুনভাবে সুন্দরবন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। সে অনুযায়ী ৪২০ একর জমিতে গরান, গেওয়া, কেওয়া, বাইন, গোলপাতা, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ কাজ শুরু করা হয়েছে।

তবে সুন্দরবনের কোল ঘেষে তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরোধী ও পরিবেশবাদীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি বহুবছর ধরে প্রাকৃতিকভাবে যে সুন্দরবন গড়ে উঠেছে তার ধ্বংস করে কৃত্রিমভাবে সুন্দরবন বানানোর বিষয়টি মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

রামপালের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে সুন্দরবন গড়ে তোলার প্রকল্পে কর্মরত বাগেরহাট সামাজিক বন বিভাগের (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কোল পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের সাথে বাগেরহাট বন বিভাগের একটি চুক্তি হয়েছে। তারা বনবিভাগকে ৪২০ একর জমি হস্তান্তর করেছে।

নিচু এলাকায়, নদী-খালের চরে সুন্দরবনের গরান, গেওয়া, কেওয়া, বাইন, গোলপাতা, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ওই এলাকায় গড়ে তোলা হবে সুন্দরবন।

একই সাথে উচু অংশে বট, তমাল, নারিকেল, সুপারি, হিজল, জারুল, সোনালো, কৃষ্ণচুড়া, নাগেশ্বর, ড্রপিংদেবদারু, কড়াই, মেহগনীসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় গাছ রোপণ করে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তোলা হবে। যা সবুজ বেল্ট হিসেবে কাজ করবে। উপকূলবর্তী এই অঞ্চলের মানুষদের ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে ওই বন। তৈরি করা হবে জীববৈচিত্র সংরক্ষণের বড়ক্ষেত্র।

বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে সুন্দরবন এবং সবুজ বেষ্টনির উপর ক্ষতির প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেন ডিএফও।

ডিএফওর তথ্যমতে, বন বিভাগ কাজ শুরু করেছে। ৭ কোটি ৯৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০২০ সাল পর্যন্ত একটানা তিন বছর সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চলবে। দু'টি মিনি নার্সারি এবং ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট থাকবে সেখানে। সুন্দরবন প্রজাতির প্রতিটি গাছ তিন ফুট দূরত্বে এবং দেশি প্রজাতির গাছ ছয় থেকে ২০ ফুট দূরত্বে রোপণ করা হবে। সেখানে ইকোট্যুরিজম এবং চিত্তবিনোদন কেন্দ্র তৈরি হবে। এছাড়া ওই বিদ্যুৎ প্রকল্পে আসা-যাওয়ার জন্য সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয় কৃষিজমি রক্ষা ও সংগ্রাম কমিটি আহ্বায়ক সুশান্ত কুমার দাস ইউএনবিকে বলেন, মানুষকে বোকা বানাতেই ওই এলাকায় সুন্দরবন গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। আসলে মানুষ এখন বোকা নয়। সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে আর পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে।

এদিকে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, মানুষ ইচ্ছা করলেই সুন্দরবন গড়ে তুলতে পারে না। প্রাকৃতিভাবে হাজার বছর ধরে নিজে নিজেই সুন্দরবন গড়ে উঠেছে। সুন্দরবন গড়ে তোলার যে কথা বলা হচ্ছে, তা মানুষের সাথে প্রতারণা।

তিনি বলেন, সরকার সুন্দরবনের গুরুত্ব বুঝলে সুন্দরবনের পাশে ক্ষতিকর কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করতো না। রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ধ্বংস হবে সুন্দরবন এবং পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে। ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হবে।

আনু মোহাম্মদ জানান, রামপালে সুন্দরবন ধ্বংসকারি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বন্ধের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। আগামী ৯ মার্চ খুলনায় ‘সুন্দরবন উপকূলীয়  কনভেনশন’ আহ্বান করা হয়েছে। আন্দোলনের মাধ্যমে সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে সরকারকে বাধ্য করা হবে বলে জানান তিনি।

সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও গবেষক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ১৫ বছরের মধ্যে সুন্দরবনের ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। এসময়ে বিদ্যুৎ প্রকল্পের ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে পরিবেশের চরম বিপর্যয় ঘটবে। দুই দেশের সরকার যত কথা বলুক না কেন; এখানে বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলে ক্ষতির প্রভাব কমাতে তারা পারবে না বলে মনে করেন ওই গবেষক।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। গাছ রোপণ করে বনায়ন করা সম্ভব; কিন্তু সুন্দরবন তৈরি করা সম্ভব নয়। সুন্দরবন রক্ষা করতে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বন্ধের দাবি জানান তিনি।

এসবের বিপরীতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন বলেন, রামপালের ওই এলাকায় সুন্দরবন গড়ে তোলা সম্ভব। সুন্দরবন প্রজাতির গাছ জন্মানোর জন্য ওই এলাকার মাটি এবং পানি উপযোগী। সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সঠিক প্রজাতির গাছ নির্বাচন করা হবে। দক্ষতার সাথে ম্যানগ্রোভ রোপণ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, জোয়ার-ভাটা প্রবাহমান এমন নদী-খালের চরে প্রথম পর্যায়ে গরান, গেওয়া, কাঁকড়া, বাইন এবং কেওরা প্রাজাতির গাছ রোপন করতে হবে। পরবর্তী ধাপে সেখানে সুন্দরবনের অন্য সব প্রজাতির গাছ রোপণের পরামর্শ দেন ড. মাহমুদ। সেখানে সুন্দরবন গড়ে তোলা হলে গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। উপকূলে ম্যানগ্রোভ গড়ে তোলার সক্ষমতা বন বিভাগের রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করা হলে সুন্দরবনের উপর ক্ষতির প্রভাব পড়বে কী-না এমন প্রশ্ন করা হলে ডা. মাহমুদ বলেন, যেকোনো স্থানে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করলে ক্ষতির প্রভাব পড়বে। তবে ওই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কি অর্জন হবে আর কি ক্ষতি হতে পারে তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।