Pran All Time

সোহাগপুর বিধবাপল্লীতে শোকের মাঝেও সুখের ছোঁয়া

UNB NEWS

মঙ্গলবার ২৪ জুলাই, ২০১৮ ০৯:৫৭:৪৪ পিএম

সোহাগপুর বিধবাপল্লীতে শোকের মাঝেও সুখের ছোঁয়া

শেরপুর, ২৪ জুলাই (ইউএনবি)- নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর বিধবাপল্লীতে ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই চালানো হয় নারকীয় তাণ্ডব। জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের নির্দেশে স্থানীয় রাজাকার ও আল বদরদের সহায়তায় পাকসেনারা এ তাণ্ডব চালায়। পাক বাহিনীর তাণ্ডবে শহীদ হন গ্রামের ১৮৭ জন বাসিন্দা। বিধবা হয় ৫৭ জন নারী।

পরবর্তী সময়ে কামারুজ্জমানানের ফাঁসির মাধ্যমে সোহাগপুর বিধবাপল্লীর কাছে দায়মুক্ত হয়েছে জাতি।  

বর্তমানে সোহাগপুরে ১২ জন বীরঙ্গনাসহ ২৪ জন স্বামী-সন্তানহারা বিধবা আর তাদের স্বজনরা বসবাস করছেন।

তবে দীর্ঘদিন এ গ্রামটি ছিল উপেক্ষিত। সরকার আর প্রশাসনের সুনজরে গ্রামটি এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। শোকের মাঝেও যেন সুখের ছোঁয়া লেগেছে বিধবাপল্লীতে।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ গ্রামের উদ্দেশে একটি চিঠি আর ২ হাজার টাকা অনুদান দেন। এ সান্তনা নিয়েই বিধবারা শুরু করেন কঠিন জীবন সংগ্রাম। জীবিকার জন্য অনেকে রাস্তার মাটি কাটা, ঝিয়ের কাজ, কেউ কেউ আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে নামেন। সোহাগপুরের প্রতি কারো কোনো টান ছিল না। উল্টো বিধবাদের গ্রাম বলে কটাক্ষ করা হতো।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরী ১৯৯৬ সালে মন্ত্রী হওয়ার পর এ গ্রামে বেঁচে থাকা ৫৭ জন বিধবাকে দুটি করে ছাগলের সাথে চাল আর ত্রাণসামগ্রী দেন। ব্র্যাক থেকে ব্যবস্থা করে দেন আজীবন মাসিক ১০০ টাকার ভাতা। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর তা বন্ধ হয়ে যায়।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাবাহিনী এ গ্রামে ৫৯টি গণকবর চিহ্নিত করে পাকাকরণ, শহীদদের তালিকাসহ স্মৃতিফলক স্থাপন এবং বিধবাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে। ২০১০ সালে ট্রাস্ট ব্যাংক আজীবন মাসিক এক হাজার টাকা দেয়া শুরু করে। সেই সাথে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও তাদের কিছু উপহার সামগ্রী দেয়। কিন্তু তারপরও ছিল না স্বীকৃতি।

গ্রামের বিধবাদের নিয়ে সরকার ও প্রশাসনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয় যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসির পর। ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় দুদফায় ১২ বিধবাকে বীরঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বিধবাদের জন্য নির্মিত হচ্ছে দুই কক্ষ বিশিষ্ট আধা পাকা ঘর। স্থাপন করা হচ্ছে টিউবওয়েল।

এদিকে, ট্রাস্ট ব্যাংকের মাসিক ভাতা এক হাজার থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা, ব্র্যাকের ভাতা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৪০০ টাকা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৫০০ টাকা ভাতা দেয়া হচ্ছে। গ্রামে প্রবেশ পথ পাকাকরণের কাজ চলছে। দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ।

সদ্য মরণোত্তর বীরঙ্গনা স্বীকৃত পাওয়া জরিতন বেওয়ার ছেলে আজগর আলী বলেন, গ্রামে সবই অইতাছে, কিন্তু শহীদগো কবর ও স্মৃতিসৌধ রক্ষা করার তো কোনো উদ্যোগ নাই।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার সাক্ষী ও শহীদ পরিবারের সদস্য জালাল উদ্দিন বলেন, সরকার ও প্রশাসনের নেক নজরে বিধবাপল্লী মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। পাশাপাশি এ গ্রামে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি বিদ্যালয় এবং একটি স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠার দাবি করি। যাতে করে মানুষ এসে জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধের সেই আত্মত্যাগের কাহিনী।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শহীদ উল্লাহ তালুকদার মুকুল বলেন, গ্রামের বিধবারা দীর্ঘ সময় কষ্ট করেছেন। এখন তারা অনেক কিছু পেয়েছেন। ৫৭ জন বিধবার মধ্যে আর মাত্র ২৪ জন বেঁচে আছেন। তারাও এক সময় গত হবেন। তাই তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে এখানে একটা স্কুল এবং স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠিত করা হোক।